ফিডের দামে দিশেহারা,
লোকসানে বন্ধের পথে দেশের পোল্ট্রি খামার ব্যবসা |
নিজস্ব প্রতিবেদক | এ আলী খান | নান্দাইল , ময়মনসিংহ |
প্রকাশ: ১৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | নিউজ প্রতিদিন বিডি |
মুরগির বাজারদর নিয়ে অনিশ্চয়তার মধ্যেই নতুন করে চাপ বাড়িয়েছে পোল্ট্রি ফিডের মূল্যবৃদ্ধি। ফিডের দাম বাড়ায় উৎপাদন খরচ বেড়ে যাওয়ায় ময়মনসিংহের নান্দাইল ও ত্রিশালের ছোট ও মাঝারি পোল্ট্রি খামারিরা পড়েছেন বাড়তি সংকটে। অনেক খামারি নতুন ব্যাচ তোলার বিষয়ে সিদ্ধান্তহীনতায় রয়েছেন।
সাম্প্রতিক বাজারতথ্য বলছে, ৫০ কেজির এক বস্তা পোল্ট্রি ফিডের দাম বর্তমানে মান ও ব্র্যান্ডভেদে প্রায় ৩ হাজার ৫৭৫ থেকে ৩ হাজার ৬৭৫ টাকা পর্যন্ত উঠেছে। অর্থাৎ কেজিপ্রতি দাম দাঁড়াচ্ছে প্রায় ৭১.৫০ থেকে ৭৩.৫০ টাকা। এর আগে একই ধরনের ফিড ৩ হাজার ৪০০ থেকে ৩ হাজার ৫০০ টাকার মধ্যে পাওয়া যেত। ফলে এক বস্তায় কয়েকশ টাকা পর্যন্ত বাড়তি খরচ পড়ছে খামারিদের।
এক মাসে কতটা বেড়েছে?
বাজারে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, আগের পর্যায়ে ৫০ কেজির ব্রয়লার ফিড প্রায় ৩ হাজার ৪০০-৩ হাজার ৫০০ টাকায় বিক্রি হলেও বর্তমানে তা প্রায় ৩ হাজার ৫৭৫-৩ হাজার ৬৭৫ টাকা। হিসাব অনুযায়ী, এক বস্তায় প্রায় ৭৫ থেকে ২৭৫ টাকা পর্যন্ত পার্থক্য দেখা যাচ্ছে।
তবে জুলাই থেকে আগস্টের বড় সময়সীমা বিবেচনায় আন্তর্জাতিক বাজার ও পরিবহন ব্যয়ের প্রভাবে বাংলাদেশে পোল্ট্রি ফিডের সামগ্রিক মূল্য ২০-২৫ শতাংশ পর্যন্ত বেড়েছিল বলে শিল্পসংশ্লিষ্ট আন্তর্জাতিক প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
ফিডে কী থাকে, কেন এত চাপ?
পোল্ট্রি ফিডের প্রধান উপাদানের মধ্যে ভুট্টা ও সয়ামিল গুরুত্বপূর্ণ। এর সঙ্গে চালের কুঁড়া, গমজাত উপাদান, ক্যানুলা মিল, লবণ, ভিটামিন, মিনারেলসহ বিভিন্ন উপকরণ ব্যবহার করা হয়। উপাদানের দাম বাড়লে তার প্রভাব সরাসরি ফিডের উৎপাদন খরচে পড়ে।
সাম্প্রতিক সময়ে ভুট্টার আন্তর্জাতিক মূল্য ও পরিবহন ব্যয় বাড়ার কারণে বাংলাদেশে ফিডের দাম বাড়ার চাপ তৈরি হয়েছে বলে শিল্পসংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।
পাইকারি, ডিলার ও খুচরা বাজারে পার্থক্য কোথায়?
ফিডের বাজারে উৎপাদক/কোম্পানি থেকে ডিলার, এরপর খুচরা বিক্রেতা—এভাবে কয়েকটি স্তরে পণ্য পৌঁছায়। সাম্প্রতিক বাজার প্রতিবেদনে পাইকারি দামের তুলনায় ডিলার পর্যায়ে প্রতি বস্তায় প্রায় ১০০-১৩০ টাকা পর্যন্ত পার্থক্য থাকার তথ্য পাওয়া গেছে।
তবে এই পার্থক্যকে পুরোপুরি ‘ডিলারের কমিশন’ বলা ঠিক হবে না। পরিবহন, গুদাম, বাকিতে বিক্রির ঝুঁকি, স্থানীয় বাজার খরচ এবং প্রকৃত কমিশন—সব মিলিয়ে চূড়ান্ত দামের পার্থক্য তৈরি হতে পারে। তাই ময়মনসিংহ ,নান্দাইল/ ত্রিশালের বাজারে প্রকৃত কমিশন জানতে কোম্পানির মূল্যতালিকা, ডিলার ক্রয়মূল্য ও খুচরা বিক্রয়মূল্য পাশাপাশি যাচাই করা প্রয়োজন।
খামারির লোকসান কোথায়?
ব্রয়লার উৎপাদনে ফিড সাধারণত মোট উৎপাদন ব্যয়ের সবচেয়ে বড় অংশগুলোর একটি। ২০২৬ সালের একটি প্রতিবেদনে খামারিদের উৎপাদন ব্যয়ের প্রায় ৮০-৮৫ শতাংশ পর্যন্ত ফিডে চলে যাওয়ার কথা উল্লেখ করা হয়েছে।
ধরা যাক, কোনো খামারি ১ হাজার ব্রয়লার উৎপাদন করছেন এবং একটি ব্যাচে ৫৬-৬০ বস্তা ফিড প্রয়োজন হচ্ছে—সেক্ষেত্রে শুধু ফিডেই বর্তমান দরে প্রায় ১ লাখ ৯৬ হাজার থেকে ২ লাখ ২০ হাজার টাকা পর্যন্ত খরচ হতে পারে। এর বাইরে বাচ্চা, ওষুধ, টিকা, বিদ্যুৎ, শ্রমিক, লিটার, পানি, পরিবহন ও মৃত্যুহারের ক্ষতি রয়েছে। একটি সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে ১ হাজার ব্রয়লারের জন্য ৫৬-৬০ বস্তা ফিডের প্রয়োজনের তথ্যও উঠে এসেছে।
ফলে মুরগির বিক্রয়মূল্য যদি উৎপাদন ব্যয়ের সঙ্গে তাল মিলিয়ে না বাড়ে, তাহলে ফিডের সামান্য মূল্যবৃদ্ধিও খামারির লাভকে দ্রুত কমিয়ে দিতে পারে।
শুধু ফিড নয়, বাজার ব্যবস্থাপনাও বড় প্রশ্ন
পোল্ট্রি খাতের বর্তমান সংকটে শুধু ফিডের দাম নয়, উৎপাদক থেকে ভোক্তা পর্যন্ত পুরো সরবরাহব্যবস্থার মূল্য নির্ধারণ প্রক্রিয়াও গুরুত্বপূর্ণ। ১৬ সেপ্টেম্বর জাতীয় ভোক্তা-অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের মতবিনিময় সভায় উৎপাদক, পাইকার, খুচরা ব্যবসায়ী ও সংশ্লিষ্ট সংগঠনের প্রতিনিধিরা বাজারের স্বচ্ছতা ও সরবরাহব্যবস্থা নিয়ে আলোচনা করেন। সেখানে উৎপাদক থেকে ভোক্তা পর্যন্ত প্রতিটি স্তরে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করার প্রয়োজনীয়তার কথা বলা হয়।
নান্দাইল/ত্রিশালে এখন যে তথ্যগুলো যাচাই জরুরি।
স্থানীয় বাজার পরিস্থিতি বোঝার জন্য নান্দাইলে অন্তত ৩-৫টি ফিডের দোকান থেকে একই ব্র্যান্ড ও একই গ্রেডের ৫০ কেজি বস্তার—
কোম্পানির তালিকাভুক্ত মূল্য
ডিলারের ক্রয়মূল্য
ডিলারের বিক্রয়মূল্য
খুচরা বিক্রয়মূল্য
নগদ ও বাকিতে দামের পার্থক্য
পরিবহন খরচ
ডিলার/খুচরা বিক্রেতার প্রকৃত কমিশন
এক মাস আগের একই পণ্যের মূল্য
সংগ্রহ করে তুলনা করা দরকার।
নিউজ প্রতিদিন বিডির বাজার পর্যবেক্ষণে প্রাথমিক চিত্র হলো—ফিডের মূল্যবৃদ্ধি খামারিদের উৎপাদন ব্যয়ের ওপর সরাসরি চাপ তৈরি করছে।
একই সঙ্গে খামারি পর্যায়ের বিক্রয়মূল্য, পাইকারি দর এবং ভোক্তা পর্যায়ের দামের মধ্যে কতটা ব্যবধান রয়েছে, সেটিও আলাদাভাবে যাচাই করা প্রয়োজন।
পোল্ট্রি খাতের সঙ্গে সংশ্লিষ্টদের মতে, উৎপাদন খরচ ও বাজারদরের মধ্যে দীর্ঘস্থায়ী অসামঞ্জস্য তৈরি হলে প্রান্তিক খামারিরা ব্যবসা থেকে সরে যেতে পারেন। এর প্রভাব ভবিষ্যতে মুরগি ও ডিমের সরবরাহ এবং বাজারদর—দুই ক্ষেত্রেই পড়তে পারে। সাম্প্রতিক বাজার আলোচনাতেও প্রান্তিক খামারি টিকিয়ে রাখা এবং সরবরাহব্যবস্থায় স্বচ্ছতার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
নিউজ প্রতিদিন বিডি বাজার পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছে। ত্রিশালের স্থানীয় ফিডের দোকান, ডিলার
ও খামারিদের কাছ থেকে পাওয়া তথ্যের ভিত্তিতে পরবর্তী প্রতিবেদনে ব্র্যান্ডভিত্তিক ফিডের দাম, ডিলার কমিশন এবং খামারির প্রকৃত উৎপাদন খরচের বিস্তারিত হিসাব তুলে ধরা হবে।
......নিউজ প্রতিদিন বিডি.....