
ব্রয়লার মুরগির যেসব অংশ খাওয়ার ক্ষেত্রে সতর্কতা জরুরি
Chicken Health | Food Safety | নিউজ প্রতিদিন বিডি
নিজস্ব প্রতিবেদক | নিউজ প্রতিদিন বিডি
মুরগির মাংস বর্তমানে মানুষের দৈনন্দিন খাদ্যতালিকার অন্যতম পরিচিত প্রাণিজ প্রোটিন। তুলনামূলক কম দাম, সহজলভ্যতা এবং নানা ধরনের রান্নার উপযোগিতার কারণে ব্রয়লার মুরগির চাহিদা ব্যাপক। তবে মুরগির প্রতিটি অংশের পুষ্টিগুণ ও খাদ্যনিরাপত্তার বিষয় এক নয়। বিশেষ করে কলিজা, চামড়া, নাড়িভুঁড়ি ও কিছু অঙ্গ খাওয়ার ক্ষেত্রে পরিমাণ, পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা ও সঠিকভাবে রান্না করা গুরুত্বপূর্ণ।
তবে একটি বিষয় পরিষ্কার করা জরুরি—ব্রয়লার মুরগির কোনো নির্দিষ্ট অংশকে সাধারণভাবে “বিষাক্ত” বা “খাওয়া সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ” বলা বৈজ্ঞানিকভাবে ঠিক নয়। বরং কোন অংশ কতটা খাওয়া হচ্ছে, মুরগিটি সুস্থ ও নিরাপদ উৎসের কি না এবং সেটি যথেষ্ট তাপে রান্না হয়েছে কি না—এসব বিষয় বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
১. কলিজা: পুষ্টিকর, তবে অতিরিক্ত নয়
মুরগির কলিজায় আয়রন, ভিটামিন ও অন্যান্য পুষ্টি উপাদান থাকে। তাই এটিকে সরাসরি ক্ষতিকর খাবার বলা ঠিক নয়।
তবে কলিজা শরীরের বিভিন্ন বিপাকীয় কাজের সঙ্গে যুক্ত অঙ্গ হওয়ায় এটি পরিমিত পরিমাণে খাওয়াই ভালো। বিশেষ করে অস্বাভাবিক রঙ, দুর্গন্ধ বা রোগাক্রান্ত মনে হলে সেটি না খাওয়াই নিরাপদ।
USDA-এর তথ্য অনুযায়ী স্বাভাবিক মুরগির কলিজার রং হালকা বাদামি/হলুদ থেকে গাঢ় লালচে হতে পারে; শুধু রঙের পার্থক্য দেখেই কলিজাকে ক্ষতিকর বলা যায় না।
২. মুরগির চামড়া: স্বাদ বেশি, কিন্তু চর্বিও বেশি
মুরগির চামড়ায় চর্বি থাকে। তাই যারা অতিরিক্ত চর্বি বা ক্যালরি কমাতে চান, তাদের জন্য চামড়া বাদ দিয়ে মাংস খাওয়া তুলনামূলকভাবে উপযোগী হতে পারে।
বিশেষ করে চামড়াসহ মুরগি যদি বেশি তেলে ভাজা হয়, তাহলে খাবারের মোট ক্যালরি ও চর্বির পরিমাণ আরও বেড়ে যায়।
তবে চামড়াকে সরাসরি বিষাক্ত বলা যাবে না।
৩. নাড়িভুঁড়ি: পরিষ্কার না হলে ঝুঁকি
মুরগির অন্ত্র বা নাড়িভুঁড়ি খাওয়ার ক্ষেত্রে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা।
অন্ত্রের ভেতরের ময়লা ভালোভাবে পরিষ্কার না করা হলে জীবাণু ও খাদ্যদূষণের ঝুঁকি থাকতে পারে। তাই বাজার থেকে কেনা নাড়িভুঁড়ি ভালোভাবে পরিষ্কার করে সম্পূর্ণ রান্না না করে খাওয়া উচিত নয়।
৪. কিডনি ও অন্যান্য অভ্যন্তরীণ অঙ্গ
কিডনি, গিজার্ডসহ মুরগির কিছু অভ্যন্তরীণ অঙ্গ অনেক জায়গায় নিয়মিত খাবার হিসেবে ব্যবহৃত হয়। এগুলোকে স্বাভাবিক অবস্থায় একেবারে নিষিদ্ধ খাবার বলা ঠিক নয়।
তবে বাংলাদেশের একটি গবেষণায় মুরগির মাংস, হাড় এবং লিভার-কিডনি-গিজার্ডের সম্মিলিত নমুনায় বিভিন্ন অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল ও ভারী ধাতুর উপস্থিতি পরীক্ষা করা হয়েছিল। গবেষণায় অধিকাংশ পরীক্ষিত অবশিষ্টাংশ নির্ধারিত সীমার নিচে থাকলেও কিছু নমুনায় সীসার মাত্রা নিয়ে উদ্বেগের বিষয় পাওয়া যায়। গবেষণাটিও নিরাপদ উৎপাদন ও নিয়মিত নজরদারির প্রয়োজনীয়তার কথা উল্লেখ করেছে।
সুত্র : PubMed Central (PMC)
২০২৪ সালের আরেকটি গবেষণাতেও বাংলাদেশের বাজারের মুরগির মাংস, কলিজা ও কিডনিতে কিছু ভারী ধাতুর উপস্থিতি নিয়ে আলোচনা করা হয়েছে। তবে এসব ফলাফল থেকে সব ব্রয়লার মুরগি বা সব অঙ্গকে স্বাভাবিকভাবে বিষাক্ত বলা যায় না।
৫. অসুস্থ বা অস্বাভাবিক অঙ্গ খাবেন না
মুরগি কাটার সময় যদি কোনো অঙ্গে অস্বাভাবিক দুর্গন্ধ, পচন, অস্বাভাবিক ক্ষত বা অন্য কোনো স্পষ্ট রোগের লক্ষণ দেখা যায়, সেটি খাবারের জন্য ব্যবহার না করাই নিরাপদ।
শুধু মুরগির বয়স বা এটি ব্রয়লার হওয়ার কারণে কোনো নির্দিষ্ট অঙ্গকে স্বয়ংক্রিয়ভাবে ক্ষতিকর ধরে নেওয়া ঠিক নয়।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়—ভালোভাবে রান্না করা
মুরগির ক্ষেত্রে শুধু কোন অংশ খাচ্ছেন সেটিই নয়, কীভাবে রান্না করছেন সেটিও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
USDA/FoodSafety.gov অনুযায়ী মুরগির মাংস, ডানা, রান, বুকের মাংস এবং giblets বা অভ্যন্তরীণ অঙ্গসহ পোলট্রির সব অংশের নিরাপদ অভ্যন্তরীণ তাপমাত্রা ১৬৫°F বা ৭৪°C হওয়া উচিত। এতে Salmonella ও Campylobacter-এর মতো ক্ষতিকর জীবাণু ধ্বংস করার ঝুঁকি কমানো যায়।
FoodSafety.gov +1
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ সতর্কতা হলো কাঁচা মুরগি ধোয়া নিয়ে সতর্ক থাকা। USDA বলছে, কাঁচা মুরগি ধুলে পানির ছিটায় জীবাণু রান্নাঘরের অন্য জায়গা বা খাবারে ছড়িয়ে পড়তে পারে। সঠিক তাপে রান্না করাই জীবাণু নিয়ন্ত্রণের গুরুত্বপূর্ণ উপায়।
সুত্র : Ask USDA FSIS
তাহলে কোন অংশ খাবেন?
সাধারণভাবে খাওয়া যায়:
বুকের মাংস
রান/উরুর মাংস
ডানা
গিজার্ড
কলিজা—পরিমিত পরিমাণে
অন্যান্য ভক্ষণযোগ্য অঙ্গ—ভালোভাবে পরিষ্কার ও রান্না করা হলে
বিশেষ সতর্কতা প্রয়োজন:
অতিরিক্ত চামড়া ও চর্বি
অপরিষ্কার নাড়িভুঁড়ি
অস্বাভাবিক বা রোগাক্রান্ত অঙ্গ
আধা-সেদ্ধ বা কম রান্না করা মাংস
সন্দেহজনক উৎসের মুরগি
ভোক্তাদের জন্য কয়েকটি সহজ পরামর্শ
১. পরিচ্ছন্ন ও বিশ্বস্ত উৎস থেকে মুরগি কিনুন।
২. কাঁচা মাংস ও রান্না করা খাবারের জন্য আলাদা বোর্ড/পাত্র ব্যবহার করুন।
৩. মুরগি ভালোভাবে রান্না করুন।
৪. সম্ভব হলে ফুড থার্মোমিটার দিয়ে ৭৪°C নিশ্চিত করুন।
৫. অতিরিক্ত তেল ও চামড়া কমিয়ে খেতে পারেন।
৬. অস্বাভাবিক গন্ধ বা চেহারার অংশ বাদ দিন।
৭. কাঁচা মুরগির সংস্পর্শে আসা হাত, ছুরি ও পাত্র ভালোভাবে পরিষ্কার করুন।
শেষ কথা
ব্রয়লার মুরগির কোনো একটি অংশকে শুধু “ক্ষতিকর” বলে পুরোপুরি বাদ দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়ার চেয়ে নিরাপদ উৎস থেকে মুরগি কেনা, পরিষ্কারভাবে প্রস্তুত করা, পরিমিত খাওয়া এবং যথাযথ তাপে রান্না করা বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
খাদ্যনিরাপত্তা নিয়ে সচেতন থাকুন, গুজব নয়—তথ্যের ওপর নির্ভর করুন।
নিউজ প্রতিদিন বিডি | সত্য ও ন্যায়ের পক্ষে আপোষহীন পথচলা